ছাগলের প্রাণঘাতী পিপিআর রোগঃ কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

ডা: মো: আব্দুর রহমান: ছাগল ও ভেড়ার ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ পেস্ট ডেস পেটিটস রুমিন্যান্টস (পি.পি.আর) বা গোট প্লেগ। এটি একটি মহামারী ও প্রাণঘাতী রোগ। এ রোগে আক্রান্ত হলে শতকরা ৮০-৯০ ভাগ ছাগলের মৃত্যু হয়। এই রোগটি সর্ব প্রথম ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে দেখা দেয়ার পর থেকে সারাদেশে এর প্রাদুর্ভাব রয়ে গেছে এবং ছাগল মারা যাচ্ছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ছাগল ও ভেড়া মারা যায়।

পি.পি.আর রোগ হলে অসুস্থ প্রাণির জ্বর, মুখে ঘাঁ, পাতলা পায়খানা, শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। অনেক সময় অসুস্থ প্রাণিটি মারাও যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি একটি মরবিলি ভাইরাস (Mrovilli virus) যার ফ্যামিলি হল প্যারমিক্সো ভাইরাস (Paramyxo Virus)। এ রোগটি বিভিন্ন গবাদি পশু ও কিছু কিছু বন্য প্রাণিতে হতে পারে। তবে এ রোগটি ছাগল এবং ভেড়াতে সচরাচর দেখা যায়।

এ রোগটি ১৯৪২ সালে আইভরী কোষ্টে প্রথম দেখা যায়। তারা এ রোগকে কাটা (kata) বলত। ১৯৮৭ সালে আরব আমিরাতে চিড়িয়াখানার প্রাণি আক্রান্ত হয়। এটি প্রথম ছাগল ভেড়া ছাড়া অন্য প্রাণি আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড। ঐ চিড়িয়াখানায় গজলা হরিণ (gazells), বুনো ছাগল (রনবী), গেমস বক (gemsbok) এর দেহে এ রোগ সনাক্ত করা হয়। ২০০৭ সালে চীনে সর্ব প্রথম এ রোগ রিপোর্ট করা হয়। ২০০৮ সালে মরোক্কোতে এ রোগ প্রথম সনাক্ত করা হয়।

কিভাবে এ রোগ ছড়ায়?

১) অসুস্থ প্রাণির চোখ, নাক, মুখ থেকে নিঃসৃত তরল, লালা, পায়খানা ইত্যাদির মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে।

২) অসুস্থ প্রাণির সংস্পর্শে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ প্রাণি আক্রান্ত হতে পারে।

৩) অসুস্থ প্রাণির হাঁচি-কাশির মাধ্যমেও এ রোগ সুস্থ প্রাণিকে আক্রান্ত করতে পারে।

৪) পানি, খাদ্য পাত্র এবং অসুস্থ প্রাণির ব্যবহৃত আসবাব পত্র দিয়েও এ রোগ ছড়াতে পারে।

৫) যে প্রাণির শরীরে জীবাণু আছে কিন্ত‘ এখনো রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়নি সে সমস্ত প্রাণির মাধ্যমে রোগ এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় স্থানান্তর হতে পারে।

৬) তবে আশার কথা হল দেহের বাইরে এ রোগের জীবাণু বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারে না।

পি.পি.আর রোগের লক্ষণঃ

১। পি.পি.আর রোগ হলে আক্রান্ত ছাগল প্রথম দিকে ঝিম ধরে পিঠ বাঁকা করে দাঁড়িয়ে থাকে।

২। নাক, মুখ দিয়ে তরল পদার্থ, শ্লেষ্মা বের হতে থাকে এবং চোখে পিচুটি থাকে।

৩। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় (১০৫-১০৭ ডিগ্রি) ফারেনহাইট।

৪। ব্যাপকভাবে নিউমোনিয়া দেখা দেয়, সেই সাথে নির্গত শ্লেষ্মা দিয়ে নাকের ছিদ্র পথ বন্ধ হয়ে যায়, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

৫। নাকে ও মুখে ঘা দেখা দিবে, উষ্ণ খুষ্ক ও দুর্বল দেখাবে।

৬। শেষের দিকে পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হয় এবং মলের রং হয় গাঢ় বাদামী। এমনকি মাঝে মধ্যে রক্ত মিশ্রিত আম থাকতে পারে।

৭। আক্রান্ত ছাগলকে সঠিক চিকিৎসা না দিলে ৪-৯ দিনের মধ্যে মারা যেতে পারে।

৮। আক্রান্তÍ ছাগলটি যদি গর্ভবতী হয়, তাহলে গর্ভপাতের সম্ভবনা থাকে।

৯। অল্প বয়স্ক প্রাণিগুলো এ রোগে অধিক আক্রান্ত হয়।

১০। ভেড়ার চেয়ে ছাগলের মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।

পি.পি.আর রোগ নিয়ন্ত্রণ

১) অসুস্থ প্রাণিকে আলাদা করে চিকিৎসা করাতে হবে।

২) অসুস্থ প্রাণির নাক, মুখ, চোখ দিয়ে নিঃসৃত তরল যাতে অন্য প্রাণির শরীরে না লাগে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৩) ছাগলের বাসস্থান জীবাণু নাশক দিয়ে পরিস্কার রাখতে হবে।

পি.পি.আর রোগের চিকিৎসা

১) পি.পি.আর রোগের নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। তবে এন্টিবায়োটিক, এন্টিহিস্টামিনিক এবং প্রয়োজনে স্যালাইন ব্যবহার করে ২য় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়ার এবং পরজীবী সংক্রমণ রোধ করে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যায়।

২) শ্বাস তন্তে¿র ২য় পর্যায়ের সংক্রমণ রোধে অক্সিটেট্রাসাক্লিন ও ক্লোর টেট্রাসাইক্লিন খুব কার্যকর।

৩) ৫% বরো-গ্লিসারিন দিয়ে মুখ ধুয়ে দিলে মুখের ক্ষত অনেক ভাল হয়ে যায়।

৪) তবে চোখের চারপাশে, নাক, মুখ পরিষ্কার কাপড় এবং কটন টিউব দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে দিনে ২-৩ বার করে।

৫) অসুস্থ ছাগলকে যত দ্রুত সম্ভব আলাদা করে ফেলতে হবে।

৬) অতি দ্রুত নিকটস্থ প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৭) অসুস্থ প্রাণিটি মারা গেলে অবশ্য ভালভাবে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

পি.পি.আর রোগ প্রতিরোধ

১) নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা না থাকায় পি.পি.আর রোগ প্রতিরোধের সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হলো ছাগল এবং ভেড়াকে নিয়মিত টিকা প্রদান করা। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে সরকারিভাবে পি.পি.আর রোগের টিকা সরবরাহ করা হয়। আগ্রহী খামারীরা উক্ত অফিস থেকে টীকা সংগ্রহ করতে পারেন।

টিকা প্রদান পদ্ধতি

ক) উৎপাদন কেন্দ্র বা সরবরাহ কেন্দ্র থেকে কুল ভ্যান /ফ্লাক্সে পর্যাপ্ত বরফ দিয়ে টিকা বহন করতে হবে।

খ) ডিসপোসেবল সিরিঞ্জ দিয়ে টিকা প্রদান করতে হবে এবং সকল রকম জীবাণুমুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে।

গ) টিকা দেওয়ার পূর্বে সরবরাহকৃত ১০০ সি.সি ডাইলুয়েন্টের সাথে ভালভাবে মিশাতে হবে।

ঘ) গুলানো টিকা রোদে নেওয়া যাবে না ও ২ ঘন্টার মধ্যে টিকা দেওয়া শেষ করতে হবে।

ঙ) প্রতিটি ছাগল বা ভেড়ার জন্য ১ সি.সি করে ঘাড়ের চামড়ার নীচে প্রয়োগ করতে হবে।

চ) সুস্থ ছাগল বা ভেড়াকে ৪ মাস বয়সে প্রথম বার, ৬ মাস বয়সে ২য় বার ও পরে বছরে একবার এ টিকা দেওয়া হয়।

ছ) প্রসবের ১৫ দিন পুর্বে গর্ভবতী ছাগল/ভাড়াকে এ টিকা প্রয়োগ করা যাবে না।

জ) আক্রান্ত বা পুষ্টিহীন ছাগল/ভেড়াকে এ টিকা প্রয়োগ করা যাবে না।

ঝ) টিকা প্রয়োগের ১৫ দিন আগে কৃমিনাশক খাওয়ানো গেলে টিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

ঞ) খামারে নতুন ছাগল/ভেড়া আনলে ১০ দিন পর টিকা প্রয়োগ করতে হবে।

ট) ব্যবহৃত টিকার বোতল বা অবশিষ্ট টিকা যথাযথ ভাবে নষ্ট করে ফেলতে হবে।

লেখক: মাস্টার্স শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *