‘ফাতেমা’র শীষে হাজার ধান

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমন মৌসুমে ‘ফাতেমা ধান’ এর বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিটি শীষে (হিজায়) ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২৫টি পর্যন্ত ধান হয়েছে। ধানের অন্য জাতের তুলনায় উচ্চফলনশীল এ জাতে দ্বিগুনের বেশি ফলন হওয়ায় এর চাহিদা দিন-দিন বাড়ছে।
কলারোয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আমন মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে কলারোয়া উপজেলার ২০ বিঘা জমিতে চাষ করা হয় উচ্চফলনশীল ‘ফাতেমা ধান’। চাষের শুরুতে প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ হলেও পরবর্তিতে আবহাওয়া অনুকূল থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ধানের এ জাতটির। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। কৃষকদের মাঝে এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শ্রমিক সংকটের ভয়। তারপরও তারা আশা করছেন সবকিছু ঠিক থাকলে এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যেই কষ্টের ফসল তুলতে ঘরে পারবেন।

‘ফাতেমা ধান’ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে তার প্রধান কারণ এর একটি শীষে ধান পাওয়া গেছে এক হাজার একশত পঁচিশটির বেশি। দেশে বর্তমান যেসব জাতের ধান চাষ হয় তার চেয়ে এই ধানের ফলন দ্বিগুণ। বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা বেতাগায় দেশে প্রথম ২০১৫-১৬ মৌসুমে চুকুলি গ্রামের কৃষাণী ফাতেমা বেগম তার ধান ক্ষেতে এক গুছিতে তিনটি ছড়া ধানের শীষ পান। একটি ধানের শিষে প্রায় এক হাজার দানার ধানে নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন ফাতেমা। ওই কৃষাণীর ছেলে লেবুয়াত ধানের চারা রোপণ করে ২.৫ কেজি বীজ ধান সংগ্রহ করেন। যা এক শতক জমিতে বীজ বপন করে ২০১৭-১৮ মৌসুমে প্রায় ৫০ শতক জমিতে ধান চারা রোপণ করা হয়। সেখান থেকেই সারা দেশে এ ধানের যাত্রা শুরু হয়। ফাতেমা বেগমের জমিতে এই ধানের প্রথম চাষ হওয়ায় এ ধান ‘ফাতেমা ধান’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ওই ধান দেখতে ও কিনতে এখন কলারোয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ভিড় জমাচ্ছেন। এমনকি অনেকে ধান কেনার জন্য অগ্রিম অর্থও দিয়ে যাচ্ছেন। বীজ হিসাবে এ ধান ৩শ টাকা কেজি দরে বিক্রির আশা করছেন চাষীরা।

কলারোয়ার হেলাতলা ইউনিয়নের ঝাঁপাঘাট গ্রামের আব্দুল খালেক শেখের ছেলে এই ধান চাষী সোহাগ হোসেন বলেন, কৃষি অফিসের মাধ্যমে বীজ সংগ্রহ করে নিজেদের জমিতে প্রথমবারের মত চাষ করি। আমার জমিতে অনেক ভালো ফলন হয়েছে। চাষী সোহাগ হোসেন জানান, অন্য ধানের মতোই সাধারণ পরিচর্চা করেন। জমিতে দুই দফায় ইউরিয়া এবং পটাশ সার ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এতে মাজরাপোকা আক্রান্ত হয় অন্য ধানের তুলনায় বেশি যে জন্য দানাদার ও রোপনের পরেই পরিমাণ মত কীটনাশক ছিটানো হয়েছে। অন্য জাতের ধানগাছের চেয়ে এই ধানগাছ অনেক লম্বা। ধানের শীষও অনেক বড়। প্রতিটি শীষে এক হাজার থেকে এক হাজার একশত পঁচিশটি দানা হয়। প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে আমার আট কাঠা জমিতে প্রায় ৮শ কেজি ধান পাবে বলে আশা করছেন চাষী সোহাগ। তিনি আরও জানান, আমার আট কাঠা জমিতে বীজ সংগ্রহ থেকে শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৭ হাজার ৮শ টাকা। এতে কুড়ি মন ধান হবে বলে আশা করছি।

যশোরের বাঁগআচড়া থেকে ধানের বীজ কিনতে আসা টিটুল ও ইব্রাহীম জানান, মানুষের মুখে মুখে শুনে তাঁরা অধিক ফলনের আশায় বীজধান ক্রয় করতে এসেছেন। চাষিরা এ সপ্তাহের মধ্যেই ধান কাটা শেষ করবেন বলে জানিয়েছেন।

উপজেলার হেলাতলা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবুল হাসান বলেন, ওই ধান রোপণ করার পর তাঁরা তত্ত্বাবধান করেন। চাষি তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী ধান চাষ করেছেন। বীজপাতা তৈরি করার পর ১৫০ থেকে ১৫৫ দিনের মধ্যে ধান কাটা যায়। এ ধান লবণ সহনীয়। ফাতেমা ধান রোপনের সময় তিনটি করে চারা রোপন করতে হয়। প্রতিটি চারার দৈর্ঘ্য ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার করতে হবে। ফলন প্রতি হেক্টরে ১১ টনের বেশি। মনে হচ্ছে, এই ধান চাষ করে চষীরা খুবই লাভবান হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহাসিন আলী বলেন, ‘ফাতেমা ধান’ অধিক ও উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান। উপজেলার ১৬টি কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবারের মত ২০ বিঘা জমিতে চাষ শুরু করে সাফল্যজনক ফলন পেয়েছেন। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘাতে পঞ্চাশ মন ধান আশা করা যায়। স্বাভাবিক অন্যান্য ধানের চেয়ে এ ধানের একটু পরিচর্যা বেশি করতে হয়। কারণ এ ধানে মাজরাপোকার আক্রমণ অন্য ধানের তুলনায় বেশি। তবে সময়মত কীটনাশক প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। উপজেলা ১৬টি চাষি প্রতান্ত অঞ্চলের ২০ বিঘা জমিতে ওই ধান চাষ করেছেন।

সূত্র: অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares