চাকুরি ছেড়ে আম চাষে সফল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নওগাঁর সোহেল 

গড়ে তুলেছেন জেলায় সবচেয়ে বড় আমবাগান

রিফাত হোসাইন সবুজ, নিজস্ব প্রতিবেদক: সীমান্তবর্তী কূলঘেসা উত্তরের জেলা নওগাঁ অর্থনীতি মূলত কৃষিপ্রধান। এ জেলার অন্যান্য খাতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলেও কৃষি খাত রয়েছে এখনও পিছিয়ে। বাপ-দাদার আদি পেশা ছেড়ে চাকরির পেছনেই ছুটছেন সবাই। আবার চাকরির বাজার মন্দা থাকায় প্রতি বছরেই বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা।

এমন অবস্থায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নওগাঁর পত্মীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নের রূপগ্রাম গ্রামের কৃষক আজিজার রহমানের ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতকোত্তর করা সোহেল রানা (৩৮)। নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের ছেলে সোহেল রানা কিছুদিন ঢাকায় চাকরি করার পর নিজ গ্রামের খাড়িপাড়া এলাকায় প্রথমে পৈতৃক ১২ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন সমন্বিত কৃষি খামার। নাম দেন ‘রূপগ্রাম এগ্রো ফার্ম’। এর পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

চেষ্টা,শ্রম,সাধনা ও অটুট নৈতিক মনোবলের কারণে তিনি এখন নওগাঁর সাপাহারে ১৪০ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক নামে বিশাল আম বাগান। স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, সোহেল রানার সমন্বিত কৃষি খামার এখন এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের অনুপ্রেরণার উৎস এবং মডেল উদ্যোগতা।

উদ্যোগতা সোহেল রানা ১৯৯৯ সালে নওগাঁর সাপাহার পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন । ২০০১ সালে সাপাহার সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সময় ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে ইত্তেফাক পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেন। স্নাতকোত্তর শেষে ঢাকার ওই মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ফিচার বিভাগের তথ্যপ্রযুক্তি পাতায় ৩০ হাজার টাকা বেতনে কাজও শুরু করেন।

সেখানে কাজ করেন প্রায় চার বছর। কিন্তু সোহেল রানা কাজে মন বসাতে পারছিলেন না। নিজের কিছু করার কথা সব সময়ই ভাবতেন। তার মনে সব সময় তার গ্রামের কথা, কৃষি ও কৃষকের কথা মনে হতো। ভেতরে ভেতরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল সেই খামার করার স্বপ্ন। সোহেল মিডিয়াতে বিভিন্ন স্থানের সফল খামারিদের গল্প আগ্রহ নিয়ে পড়তেন এবং সুযোগ পেলেই সেসব খামার পরিদর্শনে যেতেন। এই ভাবনা থেকেই ২০১৫ সালে ঢাকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে নওগাঁর পত্মীতলার দিবর ইউনিয়নের নিজ গ্রাম রূপগ্রামে ফিরে আসেন। বাড়িতে এসে স্বজনদের জানান নিজের স্বপ্নের কথা।

স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি বার বার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এর পর পরিবারের সহায়তায় ১২ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন স্বপ্নের সমন্বিত কৃষি খামার। খামারের নাম দেন ‘রূপগ্রাম এগ্রো ফার্ম’। সেখানে বিভিন্ন জাতের ফলমূল চাষ শুরু করেন। এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এর পর ২০১৫ সালের শেষের দিকে সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকায় ৩৬ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক। বর্তমানে ১৪০বিঘা জমির উপর গড়ে তুলেছেন বিশাল আম বাগান। ইতোমধ্যে তার এই বাগান দেখে এলাকার অনেক বেকার যুবক খামার ও ফলের বাগান করে আত্মনির্ভরশীল।

সাপাহারের স্থানীয় যুবক গোলাপ খন্দকার জানান, ২বছর আগে সোহেল রানা ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়। তার বাগান দেখে তার কাছে থেকে পরমর্শ নিয়ে আম বাগান গড়ে তুলি। বর্তমানে আমি ব্যক্তিগত ও কিছু লিজকৃত জমি মিলে প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে আমের চাষ করেছি। বেকার ছিলাম কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা। সোহেল রানা ভাইয়ের পরামর্শে আমি এখন সফল আম চাষি।

শাহিন আলম নামে আরেক যুবক বলেন, আমি মার্ষ্টাস শেষ করেছি ৩বছর আগে, তার পর কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। অনেক চেষ্টা করেও যখন চাকুরি নামে সোনার হরিন হয়নি ঠিক তখন সোহেল ভাইয়ের বাগানে এসে তার বিশাল কর্মকান্ড আমাকে চরমভাবে উৎসাহিত করেছে। তার পর তার কাছে থেকে আম বাগান করার বিষয়ে নানা রকম পরামর্শ গ্রহন করি। বর্তমানে আমি ব্যক্তি মালিকানাধীন ৪০বিঘা জমিতে আমের চাষ করেছি। আগামীতে বড় পরিসরে বাগান করার পরিকল্পনা আছে আমার।

সোহেল খামারে আমের পাশা-পাশি প্রায় ৪০-৪৫ প্রজাতির ফল ও গাছ রয়েছে। এখানে কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে তার আম বাগানে কাজ করছেন ১৫ থেকে ২০ জন।

কথা হয় সোহেল রানার সাথে তিনি জানান, বর্তমানে ১৮০বিঘা জমিতে বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক নামে বাগান গড়ে তুলেছি। ব্যক্তিগত জমি ৪০বিঘা এবং ১০০বিঘা লিজ নেয়া আছে। লিজকৃত প্রতিবিঘা ৭-৮হাজার করে মালিককে দিতে হয়। বর্তমানে আমার বাগানে আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১, গৌড়মতি, নাকফজলি, ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষিরসাপাত, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগসহ বেশ কয়েক জাতের আম রয়েছে। বাগানে ইতিমধ্যে আম পাড়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব জাতের আম পাড়া হবে । আম পাড়ার পর তিনি পাইকারি ও খুচরা হিসেবে বিক্রি করে থাকেন। চলতি মৌসুমে শুধু আমই ৫০লক্ষ টাকার আম বিক্রির আশা করছি। সব খরচ বাদ দিয়ে ৩০লক্ষ টাকা লাভ হবে। সবমিলে বছরে ৩০-৩৫লক্ষ টাকার মত আয় হয়ে থাকে।

সোহেল রানা বলেন, নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষির ওপর বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি বিভিন্ন সময়। এ ছাড়া যেকোনো পরামর্শের জন্য ছুটে গেছি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে। তাঁরাও বেশ গুরুত্ব সহকারে আমাকে সাহায্য করে যাচ্ছেন।

ভবিষ্যতে আরও কি ধরনের পরিকল্পনা আছে জানতে চাইলে সোহেল বলেন, এলাকাকে কৃষি খামারকেন্দ্রিক ও গ্রামীণ পর্যটন কেন্দ্র, জৈবসার ও কীটনাশক উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র, বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন দেশিগাছের (জার্ম প্লাজম) সংরক্ষণাগার ইত্যাদিসহ আধুনিক কৃষিনির্ভর করে গড়ে তুলতে চান। সে জন্য কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং উৎপাদিত ফসল ও ফলের বহুমুখী ব্যবহারের লক্ষ্যে সংরক্ষণাগার বা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন করার পরিকল্পনা করছি। যাতে নিজে আরও স্বাবলম্বী হবো সেই সাথে অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়। সবাই চাকুরির পিছনে না ছুটে যদি উদ্যোগতা হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়ায় তবে অবশ্যই ভালো করবেন। দেশে বেকারদের সংখ্যাও কমে যাবে। তবে চেষ্টা, শ্রম ও সাধনা থাকতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি নওগাঁর উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শামছুল ওয়াদুদ বলেন, নওগাঁ জেলায় সবচেয়ে বড় আম বাগান সোহেল রানার। তিনি আম বাগানের ভিতর ফাঁকা জায়গায় অন্যান্য ফল ও গাছের আবাদ করছেন। তিনি একজন শিক্ষিত যুবক হয়েওে চাকুরির পেছনে না ছুটে নিজেই গড়ে তুলেছেন বিশাল কৃষি প্রজেক্ট। যা সত্যিই প্রসংশনীয়। সোহেল রানার যখন যে ধরনের পরামর্শ দরকার কৃষিবিভাগ তা করছে।

তিনি আরও বলেন, সোহেল রানার দেখাদেখি এলাকায় অনেকই কৃষি খামার গড়ে তোলার জন্য উৎসাহিত হচ্ছেন। যদি কোন শিক্ষিত তরুণ বা যুবকরা কৃষি খামার করতে চায় তাহলে তারা ভালো করবেন। সোহেল রানা আগামীতে আরও বড় পরিসরে কৃষিতে ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করেন জেলা কৃষি বিভাগের প্রধান এই কর্মকর্তা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর থেকে পাওয়া যাবে ১৪ টন আম। সে হিসাবে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার টন।