চিংড়ি চাষে বিভিন্ন রোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা

চিংড়ি আমাদের দেশে একটি পরিচিত মাছ। এটি খেতে যেমন সুস্বাদু এবং এটি দেখতেও সুন্দর । বর্তমানে চিংড়ি রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। আমাদের দেশের উৎপাদিত চিংড়ির শতকরা ৮০ ভাগ বাগদা এবং ২০ ভাগ মিঠা পানির গলদা। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে বাগদা চিংড়ি চাষে হোয়াইট স্পট বা চাইনা ভাইরাসরোগ মারাত্মক বিপর্যয় বয়ে আনছে।

পুকুর বা ঘেরের চিংড়ির অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলেই বুঝতে হবে চিংড়ি রোগের আক্রান্ত হয়েছে। মাটির প্রকৃতি, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, অক্সিজেন, পি এইচ ইত্যাদির সমষ্ঠিগত বৈশিষ্ঠ্যের এক বা একাধিক গুণাবলী খারাপ হলে চিংড়ি দুর্বল ও রোগাক্রান্ত হয়। অধিক হারে পোনা মজুদ, অতিরিক্ত খাদ্য ও সার প্রয়োগ, কম গভীরতা উচ্চতাপ, হঠাৎ করে লবণাক্ত কম বেশী হওয়া ইত্যাদি অসহনীয় পরিবেশের কারণেই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। চিংড়ির বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার:

হোয়াইট স্পট বা চায়না ভাইরাস রোগ:
চিংড়ি পোনা ঘেরে ছাড়ার ৩০-৭০ দিনের মধ্যে এ রোগ দেখা দিতে পারে। প্রথমাস্থায় এ রোগের কোন বাহ্যিক লক্ষণ দেখা যায়না। ৩/৪ দিন পর রোগর তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। চিংড়ি পাড়ের কাছে জড়ো হয় এবং গায়ে, মাথায় খোলসে সাদা সাদা স্পট দেখা যায় এবং নির্লাভ বা লালচে হয়ে যায়। এ রোগ সাধারণত বাগদা চিংড়িতে আক্রান্ত বেশি হয়।

এ রোগের প্রতিকার: এ রোগের তেমন কোন চিকিৎসা নেই। আজে বাজে ঔষধ বা কেমিক্যাল ব্যবহার না করে পানির গুণগত মান উন্নত করতে হবে। ঘেরের তলদেশের পচাঁ কাদা মাটি তুলে ফেলতে হবে। চুন সার দিয়ে জমি প্রস্তুত করতে হবে।

মস্তক হলুদ রোগ:
ণবষষড়ি ঐবধফ নামক ভাইরাস দ্বারা এ রোগ হয়। যকৃত অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি, ফ্যাকাশে হবার ফলে মস্তক হলুদ বর্ণ ধারণ করে। পোনা মজুদের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে এ রোগ দেখা দিতে পাড়ে। এরোগের আক্রান্ত হলে ব্যাপক আকারে চিংড়ি মারা যায়। এতে চাষীর অনেক ক্ষতি হয়। এ রোগও সাধারণত বাগদা প্রজাতির চিংড়িতে আক্রমণ করে।

রোগের প্রতিকার: এরোগে চিকিৎসায় ঔষধে কাজ হয়না। ফাইটো ফ্লাংকটন চাষ করলে এ রোগ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সুষ্ঠু খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়। খামারের তলদেশে শুকিয়ে বিøচিং পাউডার/চুন দিয়ে যথাযথভাবে মাটি শোধন করে নিতে হবে।

চিংড়ির কালো ফুলকা রোগ:
পুকুরের তলায় মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইট এবং অন্যান্য জৈব পদার্থের কারণে চিংড়ির কালো ফুলকা রোগ দেখা যায়। এরোগে চিংড়ির ফুলকায় কাল দাগ ও পচন দেখা যায়। মাছের খাদ্য গ্রহণে অনীহা দেখা যায়। আক্রান্ত চিংড়ি ধীরে ধরে মারা যায়।

প্রতিকার: পুকুরের তলদেশে আচড়িয়ে দিয়ে বা হড়া টেনে দ্রুত পানি পরিবর্তনের ফলে এরোগে উন্নতি হয়। গলদা চাষে মিথাইলিন ব্লু ব্যবহার করে ভাল ফল পাওয়া যায়। অংপড়ৎনরপ ধপরফ ২০০০ সম/কেজি খাদ্যে মিশিয়ে খাওয়ালে ভালফল পাওয়া যায়। পুকুর প্রস্তুতকালীন সময়ে তলদেশের প্যাক মাটি তুলে ভালমত শুকিয়ে এবং পরিমানমত চুন/ডলমাইট/ব্লিচিং পাউডার দিতে হবে। পুকুরের পাড়ে পাতা ঝরা গাছ কেটে ফেলতে হবে।

কাল দাগ রোগ: চিংড়ির এক মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ হলো কাল দাগ রোগ। পুকুরের অত্যধিক জৈব পদার্থ থাকার কারণে এ রোগ দেখা দেয়। চিংড়ির খোলস লেজ ও ফুলকায় কাল কাল দাগ হয়। খোলসের গায়ে ছিদ্র হয়। পরবর্তীতে ফাঙ্গাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চিংড়ি মারা যায়।

প্রতিকার: দ্রুত পানি পরিবতন এবং প্যাডেল হুইলের সাহায্যে বায়ু সঞ্চালনের রোগের প্রকোপ কমে যায়। মিথাইল বøু (২-৫ পিপিএম) পানিতে ব্যবহার করে রোগ নিরাময় করা যায়।

খোলস নরম রোগ: ক্যালসিয়াম জনিত পুষ্ঠির অভাবে এ রোগ হয়। অনেকে এক স্পঞ্জ রোগ বলে। পানির লবণাক্ততা কমে গেলে ও এ রোগে বাগদা চিংড়ি আক্রান্ত হতে পারে। খোলস বদলানোর ২৪ ঘন্টা পর ও শক্ত হয় না, কম বাড়ে ও ক্রমশঃ দূবল হয়ে মারা যায়।

প্রতিকার: ক্যালসিয়ামসহ সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করে পুষ্টির অভাব দুর করতে পারলে এ রোগ ভাল হয়। পানিতে শতাংশে ১ কেজি পরিমান পাথুরে চুন প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। ভাল মত পুকুর শুকিয়ে চুন দিয়ে চাষের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। রোগের আক্রমণ হলে বড় চিংড়ি ধরে পেলতে হবে। খামারে পানি নিষ্কাশনে ও প্রবেশের পৃথক ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সতকতা ও করনীয়: প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম, চিংড়ি ঘেরের আকার ছোট করুন, পোনা মজুদহার একর প্রতি ৩ থেকে ৪ হাজারের মধ্যে রাখুন। ঘের ভূক্ত আলাদা নাসারীতে চিংড়ি পোনা ২-৩ সপ্তাহ প্রতিপালনের পর চাষের ঘেরে নালা কেটে বের করে দিন। প্রস্তুত কালীন সময়ে চুন (কমপক্ষে শতাংশে ১ কেজি) প্রয়োগ করুন। চাষকালীন সময়ে পানি পরিবতনের পরপরই প্রতি শতাংশে ৫০-১০০ গ্রাম কার্বনেট চুন প্রয়োগ করে পানি শোধন করুন। ঘেরের পানির গভীরতা কম পক্ষে ৩-৪ ফুট রাখুন। ১৫ দিন বা একমাস অন্তর অন্তর ঘেরের পানি বের করে নতুন পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রাক্ষুসে মাছ, কাকরা ও অন্যান্য চিংড়ি ভূক প্রাণী নিয়ন্ত্রণ করুন। খামার জলজ আগাছা মুক্ত রাখুন ও বাঁশের কনচি গাছের শুকনা ডালপালা দিয়ে আশ্রয় করে দিন। এছাড়া অন্য কোন সমস্যা দেখা দিলে নিকটস্থ মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শানুযায়ী ব্যবস্থা নিন। তথ্য-সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *