দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষি প্রণোদনা

সংক্রামক ব্যাধি পৃথিবীকে অনেকবারই গ্রাস করতে চেয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর আজকে এই সময়ে দাঁড়িয়ে গোটা বিশ্ব মোকাবিলা করছে এক ভয়াবহ অদৃশ্য শত্রু কোভিড-১৯ নামের এক ভাইরাসজনিত রোগ করোনার প্রাদুর্ভাবে। এই সংক্রামক ব্যাধি ছড়াতে ছড়াতে আজ বিশ্বজুড়ে ১৮ কোটি মানুষের মাঝে যেমন ছড়িয়েছে, তেমনি প্রায় ৩৮ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। সেই মহামারীর তা-ব থেকে মুক্তি পায়নি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও। বাংলাদেশে দিনে দিনে মৃত্যুর মিছিল যখন বাড়ছে, ঠিক তখন এই রোগ থেকে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ঢালরূপে আবির্ভূত হয়েছে বাংলার কৃষি। সেই ঢাল হাতে নিপুণ সৈনিক বাংলার কৃষক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর এই পুরো কর্মযজ্ঞের সফল পরিচালক বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয়, যার মূল চালিকার আসনে বসে আছেন এই কৃষি পরিবারেরই একজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, এমপি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিবান্ধব প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’ এই প্রতিপাদ্যকে পালনের জন্য দেশের এই মহামারীতে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলায় কৃষিমন্ত্রীর পদক্ষেপগুলো রীতিমতো বিশ্ব নজির হিসেবে ইতোমধ্যেই সমাদৃত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দানাদার শস্য ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দেশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১৮.১৫ লাখ হেক্টর জমির আবাদ লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন চাহিদা ছিল ৩৯৬.৪৪ লাখ টন, সেখানে আমরা এখন পর্যন্ত উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি ৩৮৬.০৮ লাখ টন। এ বছর জাতীয় গড় ফলন পাওয়া গেছে প্রতি হেক্টরে ৪.২৯ মেট্রিক টন। গত বছর দেশে বোরো ধানের জাতীয় গড় ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৪.১২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে উৎপাদন বেড়েছে এ বছর ০.১৮৫ মেট্রিক টন (৮.০৬ শতাংশ)। গত কয়েক বছরের ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ। ফলে বোরো ধান উৎপাদনে দেশ এবার নতুন রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়েছে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের ধারাবাহিক সফলতার কারণেই গত বছর আমাদের ১৯.৩ লাখ টন ধারণ ক্ষমতার মধ্যে ১২.৬৫ লাখ টন মজুদ করা সম্ভব হয়েছে।

কোভিট পরিস্থিতিতে সারাবিশ্ব আজ এলোমেলো,বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এমনি এক কঠিন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সফল যে জায়গাটি সেটি হলো কৃষি। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে এবং নির্দেশনায় কৃষিমন্ত্রীর সুদক্ষ পরিচালনায় দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ এখন একটাই- সেটি হলো ধান, সবজি, ফল উৎপাদনে আশাতীত সফল বাংলাদেশ। এবার বোরো ধান উৎপাদনে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ, সরকারি প্রণোদনা কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন, হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল জাতের অধিক চাষাবাদের আওতায় আনা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে এ বছর উৎপাদিত হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চালের উৎপাদন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারি সহায়তায় এবার এই মহামারীর মধ্যেই শেষ হয়েছে দেশের ইতিহাসে সবার আগে হাওরাঞ্চলের বোরো ধান কর্তন। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বিশ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চলভেদে ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে ধান কাটাসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে। এটি সারাবিশ্বে একটি বিরল ঘটনা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় অত্যন্ত দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতি কিনে মাঠে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মোট ধানের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ আসে হাওর এলাকা থেকে। আর এই ধান কৃষকের ঘরে তুলতে সবচেয়ে বড় সহায়তা করেন ভাসমান শ্রমিক। এ বছর শুধু হাওরভুক্ত ৭ জেলাতেই বহিরাগত শ্রমিক আনা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার (৪৯১০৮ জন)। গত বছর ধান কাটতে কম্বাইন-হারভেস্টার মাঠে নামানো হয়েছিল ১ হাজার ২৪০টি। এ বছর আরও ১ হাজার ৬৬৬টি মাঠে নেমেছে। অর্থাৎ মোট ২ হাজার ৯০৬টি হার্ভেস্টার মাঠে দেওয়া হয়েছে। রিপারও চলেছে মোট ৮৩৯টি। ধান কাটা মৌসুমে কৃষকদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের এসব কৃষিযন্ত্র নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে একদিকে শ্রমিক সংকট থাকলেও দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ কমার ফলে কৃষক লাভবান হচ্ছে।

কৃষি প্রণোদনার ক্ষেত্রে অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় এবার সরকারের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। করোনাকালে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের আস্থা ধরে রাখতে এই প্রণোদনা প্রাণের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ করেছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের ২৭ অক্টোবর, ২০২০ তারিখে রবি/২০২০-২১ মৌসুমে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, শীতকালীন মগ, পেঁয়াজ ও পরবর্তী খরিপ-১ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন মুগ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ সহায়তা প্রদান বাবদ কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ৮৬৪৩.০০ লাখ (৮৬ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার) টাকার অর্থ ছাড় করা হয়। এই অর্থ দেশের ৬৪টি জেলায় ৮ লাখ উপকারভোগীর মাঝে উল্লেখিত ৯টি ফসল চাষের জন্য সহায়তা বিতরণ করা হয়। ফসলভেদে বিভিন্ন পরিমাণে বীজ সহায়তা, ডিএপি ও এমওপি সার সহায়তা এই করোনাকালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি কৃষকের মাঝে পৌঁছে দেন। পরে একইভাবে এই প্রণোদনা ১৭ নভেম্বর, ২০২০ তারিখ রবি মৌসুমে বোরো ধানের হাইব্রিড জাতের বীজ ব্যবহারকারীদের মাঝে ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চৌদ্দ লাখ সাতানব্বই হাজার কৃষকের মাঝে ৭৬ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার ৭৬০ টাকা, ২৩ নভেম্বর, ২০২০ তারিখ রবি মৌসুমে পেঁয়াজ ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে পঞ্চাশ হাজার কৃষকের মাঝে ২৫ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ২৫ মার্চ, ২০২১ তারিখ খরিপ-১ মৌসুমে আউশ ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার কৃষকের মাঝে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার সার ও বীজ সহায়তা বিতরণ করা হয়।

করোনা মোকাবিলায় এই প্রণোদনার সুফল বাংলাদেশের কৃষক পেতে শুরু করেছে। বীজ, সারসহ নানা প্রণোদনা কৃষকদের প্রদান করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা আবাদ বৃদ্ধিতে কৃষকদের সহায়তা করেছেন।

২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন ফলের উৎপাদন এলাকা বৃদ্ধিসহ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট হর্টিকালচার উইং বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই গ্রহণ করেছেন। আশা করা যাচ্ছে এবারও ফল উৎপাদনে অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। যদিও ফলচাষিদের দাবি, সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার প্যাকেজে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার। আশা করা যাচ্ছে অচিরেই ফলচাষিরাও সরকারের প্রণোদনার আওতায় চলে আসবে।

এবারও করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলার কৃষক জয়ের ঝা-া উড়িয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর তার অকৃত্রিম সহযাত্রী হিসেবে সার্বক্ষণিক পাশে থাকা সহযোদ্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও তার সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বীরের খেতাব প্রাপ্তির অধিকার রাখে।

লেখক: কৃষিবিদ মো. আসাদুল্লাহ, মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।