যমুনার চরে ভুট্টার বাম্পার ফলন

টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার যমুনার নদীর চরাঞ্চল এলাকায় এবার ভুট্টার বাম্পার ফলন হয়েছে। এই বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে দু’চোখ যে দিকে যায় চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ প্রাকৃতির এমন দৃশ্যে মন জুড়িয়ে আসে। নদীর বুকে জেগে ওঠা প্রতিটি চরে ভুট্টা চাষ হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ বছর ভুট্টার বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। তবে তারা বড় দুশ্চিন্তা করছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে। কেননা দুর্যোগের কারণে ভুট্টা ছড়া ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, প্রতিবারের মতো এবারও টাঙ্গাইলের কালিহাতীর যমুনা নদীর চরঞ্চলে গত বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ২০২০ ও ২০২১ অর্থ বছরে ১২৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়েছে।

এছাড়াও উপজেলার গোহালিয়াবাড়ী, পটল, পাইকড়া, নারান্দিয়া, সহদেবপুর ও বাংড়া ইউনিয়নসহ ছয় ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভায় আংশিক কিছু এলাকায় ভুট্টা চাষাবাদ করা হয়েছে। এতেও ভালো ফলন হয়েছে। ১ বিঘা জমিতে চরাঞ্চলে ধান চাষ করলে ১২ থেকে ১৫ মন ধান হয় অপর দিকে ১ বিঘা জমিতে ভূট্টা হয় ৩৫ থেকে ৪০ মন। ১ মন ধানের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। ভুট্টার দামও ধানের মতই। ভুট্টা চাষে কীটনাশক ও সারের ব্যবহারও কম হয়। অন্যান্য রবি শস্যের চেয়েও ভুট্টার ফলন বেশি। তাছাড়া সহজে চাষাবাদযোগ্য এবং অধিক লাভজনক হওয়ায় ভুট্টা চাষে কৃষকরা বেশি আগ্রহী হয়েছে। তাছাড়া ভুট্টা গাছ গো-খাদ্য আর ডাটা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় কৃষকরা ভুট্টা চাষে আরো বেশি আগ্রহ সহকারে চাষাবাদ করে থাকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যমুনা নদীর অংশে উপজেলার চরঞ্চলে জেগে ওঠা চরের প্রায় প্রতিটি জমিতে ভুট্টা লাগানো হয়েছে। বাতাসে দোল খাচ্ছে ভুট্টা পাতাগুলো। মৌ-মাছিরা ভুট্টা ফুলের রেণু থেকে মধু সংগ্রহ করছে। যা চোখে পড়ার মত ছিল। মনের আনন্দে ভুট্টা কৃষকরা ভুট্টা গাছের গোড়ায় নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ, পানি সেচ, আগাছা পরিস্কার করছে।

পাইকড়া ইউনিয়নের কালোহা গ্রামের ভুট্টা চাষী দেলোয়ার হোসেন বলেন, গতবার জমিতে আমরা ধান চাষ করেছিলাম। ভুট্টা চাষে অনেকেই লাভবান হয়েছে। তাই তাদের দেখে ও পরামর্শে প্রথমবারের মতো আমরা ভুট্টা চাষে আগ্রহ হয়ে আমার ১৬০ শতাংশ জমিতে ৭৭২০ জাতের ভুট্টা চাষ করেছি। অন্যান্য ফসলের তুলনায় ভুট্টা চাষে খুবই খরচ কম হয়েছে। জমি চাষ, সার, কীটনাশক, পানি সেচ, শ্রমিক খরচ ও ভুট্টার বীজ কেনা বাবদ এবং ভুট্টা ঘরে তোলা পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হবে। যা ধান চাষের তুলনায় প্রায় অর্ধেক খরচ। ১৬০ শতাংশ জমিতে তার ১৬০ মন ভুট্টা হবে বলে আশাবাদী তিনি।

উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়ন কদিম হামজানী গ্রামের ভুট্টা চাষী মনিরুজ্জামান জানান, আমি গতবছর ১ শতাংশ জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলাম। ভুট্টা চাষে ধান চাষের চেয়েও লাভ বেশি। এজন্য এ বছর ২৫০ শতাংশ জমতি ভুট্টা লাগিয়েছি। আশা করছি প্রতি শতাংশে ১ মন করে ভুট্টা পবো। উপজেলার চরঞ্চলের শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা বালুচরে বর্ষাকালে পলিমাটি পড়ে। যা বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করার জন্য উপযোগি। কম খরচে ও কম কীটনাশক ব্যবহার করে অধিক ফলন হয়।

গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়ন সরাতৈল গ্রামের ভুট্টা চাষী বিল্লাল হোসেন বলেন, আমি ভুট্টা চাষ করে কয়েক বছরে অনেক লাভ পেয়েছি। এবারো ১০০ শতাংশ জমিতে ভুট্টা লাগিয়েছি আশা করছি গতবারের চেয়ে এবার দেড়গুণ লাভ হবে। আবহাওয়া অনূকলে থাকায় ভুট্টা গাছে ছড়াও বেশী ধরেছে। উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। তারা বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। ভুট্টা যখন আঁধা পাঁকা হয় তখন গো-খাদ্য হিসাবে উত্তরবঙ্গের কিছু কোম্পানি মালিকরা এসে অগ্রিম টাকা দিয়ে প্রতি বিঘা ২০-২৫ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে নিয়ে যায়। মেশিনে কেটে এক বছর যাবত স্টকে রেখে বিক্রি করেন।

কালিহাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন তালুকদার বলেন, উপজেলার যমুনা চরাঞ্চলের লোকেরা অন্য ফসলের চেয়ে এবার ভুট্টা চাষে আগ্রহ বেশি। ভুট্টা চাষ অধিক লাভজনক একটি ফসল। উপজেলার ৩৫০ জন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র-দরিদ্র কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা হিসেবে সুপার সাইন জাতের ভুট্টার বীজ দেয়া হয়েছে। প্রতি বিঘা জমির জন্য ২ কেজি সুপার সাইন ভুট্টার বীজ, ২০ কেজি ডিএপি সার, ১০ কেজি এমওপি সার বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরণের সার্বিক সহযোগিতা করে আসছে। আমাদের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সাথে নিরলসভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে সার্বিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এবার হেক্টর প্রতি প্রায় ১০ টন উৎপাদন হতে পারে বলে আশা করছি। বাসস